
পাখির গান মানুষকে যুগ যুগ ধরে মোহিত করেছে।
পাখি গান গায় সঙ্গী খুঁজতে, একই সঙ্গে প্রতিন্দ্বন্দ্বীকে সতর্ক করতেও।
কিন্তু এখন জানা যাচ্ছে, গান শুধু পাখিরাই গায় না, সাগররের তলদেশে অতিকায় তিমিরাও গান গায়।
হ্যাম্পব্যাক তিমি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম জলজ প্রাণী।
এদের আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো, এরা গান গেয়ে সঙ্গী খোঁজে নেয়।
বৈজ্ঞানিক ভাষায় এ গানগুলোকে বলে হাম্পব্যাক তিমির গান।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এবং কীভাবে তারা এই গানের মাধ্যমে সঙ্গী খুঁজে নেয়?
এর উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চলুন এ বিষয়ে একটু সহজ ভাষায় জানি।
হ্যাম্পব্যাক তিমি অন্যান্য প্রাণীর মতো শ্বাসনালী দিয়ে শব্দ করে না।
তাদের শ্বাসনালী ও ভোকাল কর্ডের কোন ব্যবহার নেই।
বরং এরা নাসারন্ধ্রের ভিতর থেকে বাতাস পাস করিয়ে গভীর সুরেলা গান তৈরি করে।
একেকটি গান দীর্ঘ হতে পারে ১০-২০ মিনিট পর্যন্ত এবং তারা একটানা কয়েক ঘণ্টা ধরে গাইতে পারে।
তাদের গানের বিভিন্ন রকম প্যাটার্ন থাকে, যেমন: উচ্চ সুর, নিচু সুর, আবার কখনোবা লয় পরিবর্তন হয়।
এই প্যাটার্নগুলোর মাধ্যমে তিমিরা নিজের অস্তিত্ব জানান দেয় এবং সঙ্গীকে আকর্ষণ করে।
গবেষণায় জানা গেছে, হ্যাম্পব্যাক তিমিরা মূলত প্রজননের মৌসুমে গান গায়।
গ্রীষ্মকালে যখন তারা খাদ্যের সন্ধানে থাকে, তখন গান গাওয়ার হার কমে যায়।
তবে শীতকালে, যখন তাদের প্রজনন মৌসুম শুরু হয়, তখন পুরুষ তিমিরা নিয়মিতভাবে গান গায়।
এই গান তাদের জন্য সঙ্গী খোঁজার মাধ্যম।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, তিমিরা গানের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি, সামর্থ্য, ও শারীরিক অবস্থার প্রমাণ দেয়। এই গান পুরুষ তিমিদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং নারীরা শক্তিশালী সঙ্গী বেছে নিতে পারে।
তিমির গানের সুরেলা ধ্বনি সমুদ্রের অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছায়।
সমুদ্রের গভীর পানিতে শব্দ দ্রুত চলাচল করে, তাই এদের গান কয়েকশো মাইল দূর থেকেও শোনা যায়।
গানের শব্দতরঙ্গ নারীদের আকর্ষণ করে এবং পুরুষদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রতিযোগিতায় যারা জেতে, তারাই সবচেয়ে বেশি সফলভাবে সঙ্গীকে আকর্ষণ করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, প্রতিটি অঞ্চলের হ্যাম্পব্যাক তিমিদের গান ভিন্ন ভিন্ন হয়, তবে সময়ের সাথে সাথে তারা নিজেদের গানের ধরণ পরিবর্তন করে।
২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, তিমিরা প্রতি ২-৩ বছরে একবার নতুন গান শিখতে পারে।
এই গানগুলো মহাসাগরের এক অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে, যা তাদের মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্যাম্পব্যাক তিমিরা গানের মাধ্যমে শুধু সঙ্গীই খোঁজে না, বরং এর মাধ্যমে তাদের নিজস্ব সমাজে যোগাযোগ রক্ষা করে। গবেষণা থেকে জানা গেছে, পুরুষ তিমিরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের গানের নোট পরিবর্তন করে, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার চেষ্টা করে।
কারা করেছেন এই গবেষণা
হ্যাম্পব্যাক তিমির গানের ওপর গবেষণা প্রথম দিকে শুরু হয়েছিল ১৯৭০-এর দশকে।
এ সময়ে গবেষকরা প্রথম বুঝতে পারেন যে তিমিরা শুধু শব্দ তৈরি করে না, বরং সুরেলা ধ্বনি বা গান গায়। মার্কিন জীববিজ্ঞানী এবং মেরিন বায়োলজিস্ট রজার পেইন এবং তার দল হ্যাম্পব্যাক তিমির গানের রহস্য উন্মোচনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৭১ সালে তিনি এবং তার সহকর্মীরা প্রথমবারের মতো এই তিমির গানের রেকর্ড প্রকাশ করেন। তার গবেষণায় উঠে আসে যে তিমিরা গানের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে এবং এই গানগুলি প্রজনন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রজার পেইনের স্ত্রী ক্যাটারিন পেইন ১৯৮০-এর দশকে তিমির গানের উপর একটি বিস্তৃত গবেষণা চালান।
তিনি দেখিয়েছেন, তিমিরা শুধু গান গায় না, বরং তারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের গান পরিবর্তন করে।
তিনি আবিষ্কার করেন যে তিমিরা ‘শেখা’ ও ‘বিনিময়’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের গানের নোট আপডেট করে।
২০১৫ সালে স্কটিশ গবেষক এডুয়ার্ড ডায়ল ও এলেন গার্লান্ডের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণা চালান।
তাদের গবেষণা থেকে জানা যায়, তিমিরা কয়েক বছর পর পর নিজেদের গানের ধরন পরিবর্তন করে এবং এই পরিবর্তনগুলি মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে একসাথে ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁদের আরও গবেষণায় দেখা যায়, বিভিন্ন অঞ্চলের তিমিরা একে অপরের গানের প্যাটার্ন থেকে শিখে নিজেদের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় তৈরি করে।
এডমন্ড কুক ও তার সহকর্মীরা ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গবেষণা করেন এবং এই সময়কালে তারা তিমিদের গানের সামাজিক ভূমিকা নিয়ে কাজ করেন।
তারা আবিষ্কার করেন যে, শুধু প্রজননের জন্যই নয়, বরং তিমিরা নিজেদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের জন্যও গান গায়।
ব্রিটিশ মেরিন বায়োলজিস্ট হাওয়ার্ড কাস্টেলো ১৯৯০-এর দশকে তিমির গানের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন।
তাঁর গবেষণায় দেখা যায় যে তিমিরা প্রতিবার গানের সময় এক ধরণের নির্দিষ্ট প্যাটার্ন অনুসরণ করে এবং গানের মাধ্যমে নিজেদের শক্তি ও সক্ষমতা প্রকাশ করে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি
আপনার মতামত লিখুন :