
নগর ও শিল্পবর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং চামড়াশিল্পের আধুনিকায়নে তুরস্কের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে প্রযুক্তি হস্তান্তর, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সরকার।
এর অংশ হিসেবে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, চামড়াশিল্প অঞ্চল ও একটি চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেছেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
গত ৪ ও ৫ নভেম্বর এসব স্থাপনা পরিদর্শন করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প অবকাঠামো এবং চামড়া প্রক্রিয়াকরণের প্রযুক্তিগত দিক তুলে ধরেন। এসব অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং চামড়াশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
৪ নভেম্বর ইস্তাম্বুল মেট্রোপলিটন মিউনিসিপ্যালিটির বর্জ্য দহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। ইস্তাচ (İSTAÇ) পরিচালিত কেন্দ্রটিতে প্রতিদিন তিন হাজার টন গৃহস্থালি বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের সক্ষমতা রয়েছে। কেন্দ্রটির স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫ মেগাওয়াট। সেখানে বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং তা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য তৈরি হলেও এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা করা যায় না। ফলে ভাগাড়ের ওপর চাপ বাড়ছে, দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। এ অবস্থায় বর্জ্য থেকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে বর্জ্যের ধরন, আর্দ্রতা, সংগ্রহব্যবস্থা, প্রযুক্তির ব্যয় এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
একই দিন তুজলায় অবস্থিত ইস্তাম্বুল লেদার অর্গানাইজড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (আইডিওএসবি) পরিদর্শন করেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী।
জোনটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জেলাল কোপুজসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা সেখানে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, অভিন্ন অবকাঠামো ব্যবহার এবং কেন্দ্রীয় বর্জ্যপানি শোধন ব্যবস্থার কার্যক্রম তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের চামড়াশিল্পে পরিবেশগত মান পরিপালন, বর্জ্যপানি শোধন এবং উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্যপানি শোধনাগারের কার্যকারিতা ও পরিবেশগত মান নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। তুরস্কের পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চলের অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হতে পারে।
পরে জেভাহির লেদার ইন্ডাস্ট্রি অ্যান্ড ট্রেড কোম্পানি লিমিটেডের কারখানা পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। সেখানে কাঁচা চামড়া থেকে প্রস্তুত চামড়া তৈরি, ট্যানিং, ফিনিশিং এবং জুতা ও অন্যান্য পণ্যের উপযোগী চামড়া উৎপাদনের প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন তিনি। চামড়াজাত পণ্যে মূল্য সংযোজন বাড়াতে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনশক্তির গুরুত্বও উঠে আসে এ পরিদর্শনে।
৫ নভেম্বর শিলেতে অবস্থিত এনারগ্রম থার্মাল ডিসপোজাল ফ্যাসিলিটি পরিদর্শন করেন খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। কেন্দ্রটিতে বিপজ্জনক শিল্পবর্জ্য তাপীয় প্রক্রিয়ায় শোধনের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। ইস্তাচের সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আওতায় নির্মাণ, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওটি) পদ্ধতিতে স্থাপনাটি পরিচালনা করছে এনারগ্রম। এর বার্ষিক শিল্পবর্জ্য শোধন সক্ষমতা ৩৩ হাজার টন এবং স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৫ দশমিক ৬ মেগাওয়াট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং শিল্পবর্জ্য শোধন—দুটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির পাশাপাশি কার্যকর পরিচালনব্যবস্থা, নিয়মিত পরিবেশগত নজরদারি ও আর্থিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে চামড়াশিল্পে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়াতে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, উন্নত ট্যানিং প্রযুক্তি এবং দক্ষ শ্রমশক্তি প্রয়োজন।
তুরস্কের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কারিগরি সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বিনিয়োগ অংশীদারি গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও চামড়াশিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তি গ্রহণের আগে প্রকল্পের ব্যয়, পরিবেশগত প্রভাব, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং দেশের স্থানীয় বাস্তবতা যাচাই করা প্রয়োজন।
আপনার মতামত লিখুন :