নারী পুলিশের নেতৃত্বের মুখ,চট্টগ্রামের মাটি জানে তাঁর কর্মের সুখ।
শান্তি আর ন্যায়ের দীপ্ত আলো হাতে, তিনি এগিয়ে চলেন নতুন ভোরের প্রাতে।
পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী সম্ভাবনার উদাহরণ।
একসময় যে পেশাটি শুধুমাত্র পুরুষদের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত হতো, সেখানে নারীরা আজ সমান দক্ষতায় নিজেদের স্থান করে নিচ্ছেন।
ঢাকা রেঞ্জ পুলিশের পুলিশ সুপার শাকিলা সুলতানা সেই অগ্রগামী নারীদের একজন, যিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে নেতৃত্ব ও দায়িত্ব পালনে নারী-পুরুষের কোনো ভেদ নেই।
শাকিলা সুলতানার ক্যারিয়ার পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অগ্রগতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিনি শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেননি, বরং নারী পুলিশ কর্মকর্তাদের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর জোনে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর দক্ষ পরিচালনায় একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ মামলার সফল নিষ্পত্তি হয়েছে।
ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন থেকে শুরু করে দ্রুততম সময়ে আসামিদের গ্রেপ্তারে তাঁর নেতৃত্ব জনগণের আস্থা অর্জন করেছে।
তাঁর এই কাজ প্রমাণ করে, পুলিশ বাহিনীতে নারীরাই এখন পরিবর্তনের অন্যতম চালক।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামের কৃতি সন্তান শাকিলা সুলতানা। তাঁর ডাকনাম মিতু।
শৈশব থেকেই মেধাবী এই নারী পরবর্তীতে পুলিশে যোগদান করে কর্মক্ষেত্রে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
শাকিলা সোলতানা ২০০৬ সালে ২৫ তম বিসিএস এর মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদান করেন।
পেশাগত দক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি পুলিশের বিভিন্ন পদে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
বন্দর জোনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর অসাধারণ ভূমিকা অতীতে সবার নজর কেড়েছে।
নারী পুলিশ কর্মকর্তা হলেও, কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে নারী-পুরুষের সমান দক্ষতায় এই পেশায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।
তিনি সিএমপির পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট (পিওএম) বিভাগে অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার এবং বন্দর ট্রাফিক বিভাগে ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এক যুগ পর তিনি ক্রাইম বিভাগে কাজ করার সুযোগ পান।
তিনি বন্দর জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার হিসেবে ২০২২ সালের আগস্ট মাসে যোগদান করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি চট্টগ্রামের ইপিজেড, কর্ণফুলী,পতেঙ্গা ও বন্দর থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন।
তাঁর তত্ত্বাবধানে এই অঞ্চলের সংঘবদ্ধ অপরাধ, মানবপাচার, ডাকাতি, হত্যা ও ধর্ষণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি হয়।
একাধিক ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে তিনি প্রশংসিত হয়েছেন।
শাকিলা সুলতানার নেতৃত্বে কর্ণফুলীতে জমি নিয়ে বিরোধের কারণে সংঘটিত জোড়া খুনের ঘটনা দ্রুত সমাধান হয়েছে।
আসামিদের গ্রেপ্তারে তাঁর তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ জনগণের কাছে পুলিশের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে।
বন্দর জোনে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর নেতৃত্বে চার থানার পুলিশ সদস্যরা একাধিক মুলতবি থাকা মামলার দ্রুত তদন্ত ও নিষ্পত্তি নিশ্চিত করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর কার্যক্রমে তাঁর দিকনির্দেশনা পুলিশ সদস্যদের কাজের মান উন্নত করেছে।
এই সাফল্যের জন্য তিনি পেয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও।
শাকিলা সুলতানার এই সাফল্য একক নয়, বরং বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীতে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ ও সফলতারই প্রতিফলন।
নারী হিসেবে পুলিশের কঠিন দায়িত্ব পালন করা সহজ নয়, কিন্তু শাকিলা সুলতানা দেখিয়েছেন, ইচ্ছা ও যোগ্যতা থাকলে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে থাকেন না।
তিনি বলেন, “পুলিশ জনগণের বন্ধু, শত্রু নয়।
আমাদের কাজ জনগণের সেবা করা।
এজন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
তথ্য দিয়ে আমাদের সাহায্য করলে সঠিক সেবা দেওয়া সম্ভব।”
নারী হিসেবে পুলিশের কঠিন দায়িত্ব পালন করা সহজ নয়, কিন্তু শাকিলা সুলতানা দেখিয়েছেন, ইচ্ছা ও যোগ্যতা থাকলে নারীরা কোনো কাজেই পিছিয়ে থাকেন না।
তিনি বলেন, “পুলিশ পেশায় নারীদের কাজের সুযোগ বাড়ছে, যা আমাদের জন্য একটি ইতিবাচক পরিবর্তন।
সর্বশেষ শাকিলা সুলতানা ইতিহাসের প্রথম নারী পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর ও দক্ষিণ বিভাগের উপ-কমিশনার হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি যোগ দেন ঢাকা ডিআইজি রেঞ্জে এবং সেখানেও তিনি পূর্ববর্তী কর্মজীবনের ন্যায় তাঁর কাজের মাধ্যমে মেধা, সাহসিকতা এবং দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরেছেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ তাঁকে এখনো স্মরণ করেন।
নারীরা এখন পুলিশ বাহিনীতে শুধু সংখ্যা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নন; তাঁরা দক্ষতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের মাপকাঠিতেও নিজেদের আলাদা করে তুলছেন।
শাকিলা সুলতানা সেই ধারার পথিকৃৎ।
তাঁর এই পথচলা শুধু পুলিশ বাহিনীর জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি অনুপ্রেরণার বার্তা।
এটি স্পষ্ট যে ভবিষ্যতে নারীরা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে আরো বেশি দায়িত্ব পালন করবেন এবং শাকিলা সুলতানার মতো ব্যক্তিত্ব তাঁদের সেই পথচলার দিশারী হয়ে থাকবেন।
এই পথচলার শুরু শুধু একটি ব্যক্তিগত যাত্রা নয়, এটি একটি জাতীয় অগ্রগতির সূচনা, যেখানে নারী ও পুরুষ সমানতালে এগিয়ে যাবে একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে।
শাকিলা সুলতানারা সেই সম্ভাবনার দরজা খুলে দিচ্ছেন, যা আগামী প্রজন্মের নারীদের জন্য এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হয়ে থাকবে।
মেয়েরা যদি শাকিলা সুলতানার পথ অনুসরণ করে পুলিশে যোগ দেয়, তাহলে তাঁরা এই মহান পেশার অংশ হয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন।
শাকিলা সুলতানার মতো নারীরা কেবল সফল পুলিশ কর্মকর্তা নন; তাঁরা নারীদের স্বপ্ন দেখার এবং তা পূরণের সাহস জোগানোর জীবন্ত প্রেরণা।
তাঁর এই যাত্রা শুধু চট্টগ্রামের মেয়েদের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের নারীদের জন্য একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।